করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় ঘরে থাকুন, সুস্থ্য থাকুন। রূপকল্প ২০৪১
Latest Activities

উল্কাপাত কি ও কেন?

Detail
দিনের বেলায় আকাশে তাকালে, আমরা কী কী দেখতে পাই? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নানান রকম পরিবেশ পরিস্থিতির কথা আমাদের মনে উঁকিঝুঁকি দেবে। যদি ঘন মেঘে আকাশ থাকে আচ্ছন্ন, তবে তো মেঘ ছাড়া আর কিছু দেখাই যাবে না। আর যদি হয় মেঘমুক্ত আকাশ, তাহলেই কি খুব বেশি তফাৎ কিছু হবে? না। কারন,উজ্জ্বল সূর্যালোকের প্রভাবের কারণে আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হবে না। অবশ্য এক্ষেত্রে বাদ দিতে হবে, উড়ন্ত পাখি বা উড়োজাহাজকেও। কিন্তু বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা হব-হব, অন্ধকার ডানা ছড়িয়ে গ্রাস করছে বসুধাকে, তখন মহাজাগতিক বিস্ময়ের এক দুয়ার খুলে যায় আমাদের চোখের সামনে। মেঘমুক্ত রাতের আকাশে দেখা দিতে পারে “ঝলসানো রুটি” সম পূর্ণিমা চাঁদ, স্থির উজ্জ্বল অপলক নক্ষত্র বা মিটমিট করতে থাকা শতশত তারা। আমাদের পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদ তার উপস্থিতি দিয়ে রাতের আকাশের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। এছাড়াও রাতের আকাশে মাঝেমাঝে দেখা যায় আর এক বিশেষ প্রকার মহাজাগতিক বস্তু। নগ্ন চোখ দিয়ে যখন আমরা রাতের আকাশের সৌন্দর্য উপভোগ করি, মাঝেমাঝে আমরা কিছু এলাকা জুড়ে পৃথিবীর দিকে ধাবিত কিছু আলোর মত বস্তু দেখতে পাই যা দীর্ঘ লেজ বিশিষ্ট ধূমকেতু থেকে তৈরি হয়। এই বিশেষ প্রজ্বলিত বস্তু, যদি পৃথিবী পৃষ্ঠতলের ওপর পতিত হওয়ার আগেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় তখন সেগুলিকে আমরা বলি “উল্কা”। অর্থাৎ, উল্কা হল মহাকাশে পরিভ্রমণরত পাথর বা ধাতু দ্বারা গঠিত ছোট মহাজাগতিক বস্তু যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে বায়ুর সংঘর্ষে জ্বলে উঠে। আর বায়ুমণ্ডলে নিঃশেষিত না হয়ে যদি আছড়ে পড়ে ধরণীপরে, তখন তাকে বলি উল্কাপিণ্ড। এই দুই-এ মিলে হয় উল্কাপাত (চিত্র ১)। একটি সহজ বীজগাণিতিক সমীকরণের সাহায্যে যদি দেখি, তাহলে
উল্কাপাত (Meteoroid) = উল্কা (Meteor) + উল্কাপিণ্ড (Meteorite)

চিত্র ১। বায়ুমণ্ডলে প্রজ্বলিত উল্কা ও ভূমিতে পতিত উল্কাপিণ্ড
ভিডিওটি দেখলে ব্যাপারটি আরও সহজবোধ্য হবে। (লিংক)
উল্কাপিণ্ড গ্রহাণুর তুলানায় আকারে অনেক ক্ষুদ্র। যখন কোন উল্কা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে তখন এর গতিবেগ সেকেন্ডে প্রায় ২০ কিমি. হয়। অধিকাংশ উল্কাই সৌরজগতের মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের মধ্যে অবস্থিত একটি উপবৃত্তাকার গ্রহাণু বলয় থেকে আসে। এই গ্রহাণু বলয় ছাড়াও, উল্কা সৌরজগতের অভ্যন্তর অঞ্চল থেকেও উৎপত্তি লাভ করতে পারে। আর এই কারণেই, পৃথিবীপৃষ্ঠের উপর পাওয়া বেশ কিছু উল্কা চাঁদ বা মঙ্গল গ্রহ থেকে উৎপন্ন হয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। কোন একটি পৃথিবী-বহির্ভূত বস্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে যখন ঢোকে তখন কী ঘটনা ঘটে? বস্তুটির চাপ, তাপমাত্রা, উপাদান, ভর প্রভৃতি পরিবর্তিত হয়। আর কী হয়? বায়ুমণ্ডলীয় উপাদানের সঙ্গে বস্তুর সংঘর্ষ ঘটে ও রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্পাদিত হয়। ফলে বস্তুর অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে উল্কার বহিঃপৃষ্ঠ পুড়িয়ে দেয়। এসময়ে এ্যারোডাইনামিক্স তাপের কারনে উজ্জ্বল আলোক ছটার সৃষ্টি হয় আর একে “তারা খসা” (Shooting Star) বলি। কিছু কিছু উল্কা একই উৎস হতে উৎপন্ন হয়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে প্রজ্জ্বলিত হয় যাকে বলি উল্কা বৃষ্টি (চিত্র ২)।

চিত্র ২। তারা খসা ও উল্কা বৃষ্টি
উল্কা সংগ্রহের পদ্ধতির উপর নির্ভর করে, এদের দুই শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। উল্কা পতনের সময় এটা যদি দৃশ্যমান হয় আর তারপর একে সংগ্রহ করা হয় তাহলে একে বলা হয় “FALL”, আর অন্য যে কোন উপায়ে যদি এটা সংগ্রহ করা হয়, তাহলে একে “FIND” বলা হয়। সাধারণত, উল্কাকে তিনটি দলে ভাগ করা হয় (চিত্র ৩)। এগুলি হলো –
  1. স্টোনি উল্কা (Stony meteorites): এরা প্রধানত সিলিকেট খনিজ দ্বারা তৈরি। অধিকাংশ উল্কাই এই শ্রেণিভুক্ত। পৃথিবীপৃষ্ঠে পাওয়া মোট উল্কার প্রায় ৮৬% এই দলের অন্তর্গত।
  2. আয়রন উল্কা (Iron meteorites): এরা প্রধানত লোহা-নিকেল ধাতু দিয়ে গঠিত। পৃথিবীপৃষ্ঠে পাওয়া মোট উল্কার প্রায় ৬% এই দলের অন্তর্গত।
  3. স্টোনি-আয়রন উল্কা (Stony-Iron meteorites): এরা লোহা-নিকেল ধাতু ও সিলিকেট খনিজের মিশ্রণ দ্বারা গঠিত। বাকি ৮% এই দলের অন্তর্গত।

চিত্র ৩। বিভিন্ন প্রকার উল্কা
উল্কা নিয়ে ক্রমাগত এবং উন্নত গবেষণা তাদের রাসায়নিক গঠন ও খনিজ উপাদানের উপস্থিতি সংক্রান্ত জ্ঞান আরও বিভিন্ন শ্রেণী এবং উপশ্রেণীতে তাদের ভাগ করেছে। বিশদ আলোচনা এই প্রবন্ধে করার অবকাশ নেই।
অধিকাংশ উল্কাই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের অব্যবহিত পরেই খণ্ড খণ্ড হয়ে ভেঙ্গে যায়। গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে ১০ গ্রাম-এর চেয়ে বড় ১৮০০০-৮৪০০০ উল্কা পৃথিবীপৃষ্ঠে পৌঁছায়, যার মধ্যে শুধুমাত্র বছরে পৌঁছায় মাত্র ৫ থেকে ৬ টুকরো। পৃথিবীপৃষ্ঠের কোন জায়গায় উল্কা পড়ল আর আবিষ্কৃত হল সেই অনুযায়ী হয় নামকরণ। আর যদি একাধিক উল্কা একই স্থানে পাওয়া যায়, তাহলে তাদের নামকরণ করা হয় ক্রমানুসারে। উল্কার আকার হতে পারে নানান রকম। এর ব্যাস কয়েক মিলিমিটার থেকে বেশ কয়েক মিটার পর্যন্ত হতে পারে। একটি বড় আকারের উল্কা পৃথিবীপৃষ্ঠের উপর যখন পড়ে, তখন একটি বেশ বড়সড় জ্বালামুখ পৃথিবীপৃষ্ঠের উপর তৈরি হয়। আজ যদি আমরা পিছন ফিরে তাকাই, তখন দেখতে পাই যে, অতীতে উল্কাপাতের সময় পৃথিবীপৃষ্ঠের সঙ্গে সঙ্ঘাতে অনেক জ্বালামুখ সৃষ্টি হয়েছে, যার সঙ্গে পৃথিবী থেকে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনাকেও কোন কোন ভাবে দায়ী বলে ভাবা হয়।
যদিও উল্কা পৃথিবীপৃষ্ঠের উপর যেকোনও জায়গায় পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু FALL এবং FIND উভয় ধরনের উল্কার সংগ্রহ এন্টার্কটিকা মহাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। আর এরপর যে অঞ্চল থেকে এদের সংগ্রহ করা হয় তা হল মরুভূমি এলাকা। আর খুব সামান্য কিছু সংগৃহীত হয়েছে বাকি অন্য দেশ এবং সমুদ্র ও মহাসাগর সহ অন্যান্য মহাদেশ থেকে। এর অর্থ এই নয় যে শুধুমাত্র এন্টার্কটিকা বা মরুভূমি এলাকায় উল্কা প্রচুর সংখ্যক পড়ে, বরং বলা যায় এই উভয় এলাকার ভৌগলিক স্বভাব তাদের আবিষ্কারের জন্য সহায়ক হয়। এন্টার্কটিকার ভূপৃষ্ঠের ৯৮%-এরও বেশি তুষার ও বরফ দ্বারা আচ্ছাদিত। বরফমুক্ত এলাকায় মোট আয়তন মাত্র ২% যার মধ্যে পড়ছে পাহাড়, নুনাটক (nunataks) এবং ওয়েসিস (Oases)। নুনাটক উন্মুক্ত, পাথুরে উপাদান-এর একটি সেতুবন্ধ, ন্যাড়া পাহাড় শিখর কিংবা একটি বিরাট বরফক্ষেত্র বা হিমবাহ। একে বরফতুল্য দ্বীপও বলা হয়। নুনাটক শব্দটি সাধারণত ব্যবহৃত হয় যেখানে একটি স্থায়ী বরফাঞ্চলের উপস্থিতি রয়েছে। ওয়েসিস হল মরুভূমির মধ্যে একটি ছোট উর্বর ভূমি বা মরুদ্যান যেখানে সাধারণত একটি বসন্ত বিরাজ করে। পৃথিবীপৃষ্ঠের উপর বৃহত্তম বরফ-আবৃত জায়গা হল এই এন্টার্কটিকা যে তার নিজের ওজন এবং মাধ্যাকর্ষণের কারণে সারা বছর ধরে উত্তরদিকে একটি নির্দিষ্ট বিচলন বেগে এগিয়ে আসছে। বিগত কয়েক লক্ষ বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্ন ও পুরু তুষার চাদর দ্বারা আবৃত এন্টার্কটিকার উপর উল্কা পতন হচ্ছে। যেখানে পর্বত ও নুনাটক রয়েছে সেখানে পোলার বরফ খণ্ডের একটানা গতি মন্দীভূত হয় কারন এরা বাধা হিসেবে কাজ করে। বরফ প্রবাহের এই ডিফারেনশিয়াল আন্দোলন নিচের দিকের তুষার বা বরফ স্তরকে হিমবাহ পৃষ্ঠতলে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করে। দক্ষিণদিকের গ্রীষ্মকালে (নভেম্বর – মার্চ) বাতাসের উচ্চগতি এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমশৈলের উপরের অংশ গলতে থাকে, ফলে পুরু বরফের মধ্যে আটকে থাকা উল্কাপিণ্ডের জায়গা পরিবর্তিত হয়; পতনের জায়গা থেকে দূরে সরে যায় এবং হিমশৈলের প্রান্তভাগের কাছাকাছি ঘনীভূত হয়। নীলাভ বরফ এবং গাঢ় রঙের উল্কাপিণ্ডের মধ্যে রং-এর পার্থক্য থেকেই সহজে উল্কাপিণ্ড গুলিকে এই সম্ভাব্য অঞ্চলে চিহ্নিত করা যায়। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা অধ্যয়ন করেই, এন্টার্কটিকা থেকে অনেক উল্কাপিণ্ড সংগ্রহ করা গেছে। মরুভূমি এলাকাতেও, ধূলি মলিন বালি এবং গাঢ় রঙের উল্কাপিণ্ডের মধ্যে রং-এর পার্থক্য থেকেই উল্কাপিণ্ড শনাক্ত করা যায়। অন্যান্য জাগতিক বস্তুর বিভিন্ন রং উল্কাপিণ্ডের গাঢ় রঙের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় বলে অন্যান্য স্থানে এদের উপস্থিতি শনাক্ত করা এবং সংগ্রহ করা অনেক কঠিন হয়ে যায়।
বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি আমাদের অনেক এগিয়ে নিয়ে গেলেও আমাদের নিজস্ব পৃথিবীর বাইরে সুবিশাল মহাজাগতিক স্থান সংক্রান্ত বিষয়ে বিস্তারিত এবং সঠিক তথ্য আমরা এখনও বিশেষ জানি না। উল্কাপিণ্ড যেহেতু মহাজাগতিক স্থান থেকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে তাই এর অধ্যয়নও গবেষণা মহাজাগতিক গঠন বা অন্যান্য অনেক গ্রহের উৎপত্তি সেইসাথে তাদের গঠন সম্পর্কে আমাদের বুঝতে সাহায্য করে। এখনও পর্যন্ত মানুষের পক্ষে স্বশরীরে অন্য কোনো গ্রহে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, কিন্তু সেই গ্রহ থেকেই উৎপন্ন উল্কা পৃথিবীতে এসে সেই গ্রহের গঠন এবং উৎপত্তি সম্বন্ধে আমাদের নানা সূত্র/ইঙ্গিত দিচ্ছে, আর তার ভিত্তিতেই হচ্ছে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক তদন্ত। জীবনের উৎপত্তি এবং জীবনের অন্যতম উপাদান কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন – সেই সাথে তাদের সংযুক্তিকরণ ও বিয়োজন এই উল্কাপিণ্ড থেকে চর্চিত হয়। ভবিষ্যতে, উল্কাপিণ্ডের বিস্তারিত গবেষণা অন্যান্য গ্রহে ও মহাজাগতিক স্থানে জীবনের অস্তিত্ব জানার উপায় হিসেবে বিবেচিত হবে বলে ভাবা হচ্ছে।
জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (GSI) ভারতে পাওয়া সমস্ত উল্কাপিণ্ডের জিম্মাদার সংস্থা। GSI এগুলিকে সংগ্রহ করে এবং এই বিষয়ের সমস্ত তথ্য বজায় রাখে। ভারতের নানান প্রান্ত থেকে উল্কাপিণ্ড সংগ্রহ করা হয়েছে এবং GSI-এর সদর দফতর কলকাতায় উল্কা জাদুঘরে রাখা আছে। ২০১২ সালে এন্টার্কটিকায় ৩২তম ভারতীয় বৈজ্ঞানিক অভিযান চলাকালে একটি উল্কা গবেষণা কর্মসূচি শুরু হয়। ফিজিকাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি (PRL), আহমেদাবাদ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিও পদার্থ বিজ্ঞান-এর একটি গবেষক দল উল্কাপিণ্ড নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করছেন।
অবশেষে এটা বলা যেতে পারে যে, উল্কাপিণ্ড-গবেষণা গ্রহ এবং অন্য মহাজাগতিক বস্তুর উৎপত্তি ও বিবর্তন বুঝতে একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। নিঃসন্দেহে, মহাবিশ্বের যেসকল তথ্য এখনও পর্যন্ত উন্মোচিত করা সম্ভব হয়নি তা এই গবেষণা থেকে পাওয়া যেতে পারে। সুতরাং, উল্কাপিণ্ডের বৈজ্ঞানিক সংগ্রহ এবং এর গবেষণায় উৎসাহ ও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

স্টিফেন হকিং এর জীবন যাত্রা

Detail
তিনি একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, মহাবিশ্ববিদ, লেখক, বিজ্ঞান জনপ্রিয়কারী, কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক মহাকাশবিদ্যা বিভাগের পরিচালক, এবং প্রফেসর। পড়াশোনা করেছে, কিন্তু তার নাম জানে না, এমন মানুষ মনে হয় গোটা দুনিয়াতে একজনও পাওয়া যাবে না। বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা মেধাবী এই মানুষটার নাম স্টিফেন উইলিয়াম হকিং। জীবনের বেশির ভাগ সময় মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হয়ে হুইলচেয়ারে কাটিয়েছেন, তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারিয়েছেন। তারপরেও তার অর্জনের খাতা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি মহিমান্বিত। আসুন, আজ আমরা এই অসামান্য মেধাবী লোকটার জীবনের গল্প শুনি।

জন্ম ও শৈশব

তার বাবা-মা দুজনেই অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করতেন, কিন্তু তখন তাদের দেখা হয়নি। আমরা অনেক সময় যুদ্ধকালীন সময়ের রোমান্সের গল্প পড়ি। তাদের গল্পটা বুঝি অনেকটা সেরকমই। পড়াশোনা শেষ করার পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার কিছু সময় পর লন্ডনে তাদের দেখা হয়েছিলো। চারিদিকে জার্মান বোমা পড়ছে, এমন একটা সময়ে মা ইসোবেলের গর্ভে এলেন স্টিফেন হকিং। তার জন্ম হয়েছিলো অক্সফোর্ডেই, ১৯৪২ সালের ৮ই জানুয়ারি। জন্মের আগেই গর্ভবতী মা লন্ডন ছেড়ে অক্সফোর্ডে চলে এসেছিলেন, কারণ লন্ডনে তখন প্রায়ই সাইরেন বাজে; “বোমারু বিমান আসছে”- সেই সাইরেন।
মেধাবী পরিবারেই জন্ম হয়েছিলো তার, এবং মা-বাবা ছেলেমেয়ের পড়াশোনার দিকে বেশ মনযোগও দিয়েছিলেন। প্রাইমারি স্কুলে অনেকদিন পার করার পরেও হকিং পড়তে পারতেন না, এজন্য তিনি স্কুলকেই দোষ দিয়েছেন। অবশ্য সেটা কেটে গিয়েছিলো কয়েক বছরের মধ্যেই, ইন্টারমিডিয়েটও পাশ করে ফেলেছিলেন অন্যদের চেয়ে এক বছর আগেই, প্রধান শিক্ষকের বিশেষ অনুমতি নিয়ে।

তার আগে অবশ্য আসে হাই স্কুল (শুরু হয় ক্লাস নাইন থেকে, টুয়েলভে গিয়ে শেষ হয়)। বাবা চেয়েছিলেন নামকরা ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলে পড়াতে, কিন্তু বিধি বাম! স্কলারশিপের জন্য একটা পরীক্ষা দিতে হয়, আর সেই পরীক্ষার দিন হকিং অসুস্থ হয়ে পড়লেন, পরীক্ষা আর দেয়া হলো না। আর এত টাকা খরচ করে সেখানে পড়ানোর মত অবস্থাও বাসায় ছিলো না। তাই আগের স্কুল সেইন্ট আলবানস-ই সই! সেখান থেকেই ইন্টার পাশ করেছিলেন তিনি। ও হ্যাঁ, আরেকটা জিনিস, স্কুলে অনেকেই তাকে “আইনস্টাইন” বলে ডাকতো। এতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে, বলুন!

অক্সফোর্ডে পড়াশোনা

১৯৫৯ সাল। হকিং এর বয়স ১৭।
আগেই বলেছি, তার বাবা-মা অক্সফোর্ডে পড়েছিলেন। ইউরোপ-আমেরিকাতে একটা জিনিস খুব বেশি চলে। বাবা-মা চায়, তাদের সন্তান তাদেরই ইউনিভার্সিটিতে পড়ুক; তারা যে হাউজে থাকতেন, সেই হাউজেরই সদস্য হোক। নিজ নিজ হাউজের জন্য অনেকে অনেক অনুদানও দেয়।
বাবা চাইলেন, “তুমি আমার ছেলে, তুমি আমার মত ডাক্তারি পড়বে”।
ছেলে বললো, “গণিত পড়বো”।
বাবা বললেন, “গণিত পড়লে খাবে কী? তাছাড়া তুমি অক্সফোর্ডে পড়বে, এটা নিয়ে কোনো ওজর আপত্তি শোনা হবে না। অক্সফোর্ডে গণিত বলে কোনো বিষয় নাই”। হুম, ঐ আমলে অক্সফোর্ডে ম্যাথামেটিক্স ছিলো না।
ছেলে বললো, “আচ্ছা, অক্সফোর্ডে পড়বো, কিন্তু ডাক্তারি পড়বো না। ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি পড়বো। এটা নিয়ে কোনো ওজর আপত্তি শোনা হবে না।” —- এগুলো সম্পূর্ণ আমার মস্তিষ্কপ্রসূত কাল্পনিক ডায়লগ, কিন্তু কাহিনী সত্য!
যাই হোক, তরুণ হকিং সাহেব “আইনস্টাইন” ডাকনামটার নামকরণের সার্থকতা যাচাই করে যাচ্ছিলেন অক্সফোর্ডে এসেও। পড়াশোনা নাকি পানিভাত ছিলো তার কাছে। তাকে পদার্থবিজ্ঞানে একাডেমিক কোনো সমস্যা দিলেই সমাধান হাজির- এটা তার তৎকালীন প্রফেসর রবার্ট বারম্যানের মন্তব্য। এজন্য পড়াশোনার দিকে তার ধ্যান ছিলো খুবই কম। অনার্স জীবনের তৃতীয় বছরে পড়াশোনা বলতে প্রায় বাদ দিয়ে টোঁটো করে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, বন্ধু বান্ধব বানানোর দিকে মনযোগ দিলেন। চতুর্থ বছরে, ফাইন্যাল পরীক্ষার ফলাফল এমন হলো যে ফার্স্ট ক্লাস নাকি সেকেন্ড ক্লাস- সেটা নির্ধারণের জন্য ভাইভা প্রয়োজন হলো। অমনযোগী ছাত্র হিসেবে ততদিনে তিনি বেশ সুনাম(!) কামিয়েছেন। ভাইভাতে গিয়ে তিনি সেটার সুযোগ নিলেন। ভবিষ্যত পরিকল্পনা জিজ্ঞেস করার পর তিনি যা বলেছিলেন, সেটা সরাসরি অনুবাদ করে তুলে দিচ্ছি, “যদি আমাকে ফার্স্ট ক্লাস দেন, তাহলে কেম্ব্রিজে চলে যাবো, ওখানে গিয়ে মহাবিশ্বতত্ত্ব পড়বো। যদি সেকেন্ড ক্লাস দেন, তাহলে অক্সফোর্ডেই থাকবো। মনে হয়, ফার্স্ট ক্লাস দিয়ে বিদেয় করে দিলেই ভালো হবে”।
তিনি ভাইভা বোর্ডের শ্রদ্ধা অর্জন করলেন, ফার্স্ট ক্লাস পেলেন, ইরান থেকে ঘুরে এলেন, শুরু করলেন কেম্ব্রিজের পিএইচডি জীবন।

কেম্ব্রিজে পিএইচডির দিনগুলি

বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ফ্রেড হয়েল তখন কেম্ব্রিজে পড়াচ্ছেন। হকিং চেয়েছিলেন, তার সাথে কাজ করতে। কিন্তু তাকে সুপারভাইজার হিসেবে পাওয়া গেলো না। হয়েল অনেক ব্যস্ত ছিলেন, এটা একটা কারণ হতে পারে। যারা হয়েলকে চেনেন না, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি – আমরা এখন জানি যে, আমরা সবাই নক্ষত্রের সন্তান। আমাদের শরীরের প্রত্যেকটি অণু পরমাণু কোনো একটা নক্ষত্রের হৃদয়ে তৈরি হয়েছে। কার্ল সেগান এই ধারণাটাকে সবার মধ্যে জনপ্রিয় করে দিয়েছিলেন “we are star stuff” উক্তি দিয়ে। কিন্তু সেই একাডেমিক গবেষণা করেছিলেন ফ্রেড হয়েল এবং তার সহযোগী গবেষকরা (মার্গারেট বারবিজ, জেফ্রি বারবিজ, আর উইলিয়াম ফাওলার)। B2FH paper লিখে গুগল করলেই আর্টিকেলটা পেয়ে যাবেন। এমন একটা গবেষকের সাথে কাজ করতে না পেরে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিলো তার। তবে, তিনি যাকে পেয়েছিলেন, সেটা হকিং এর জন্য শাপে বর হবে একদিন। তার সুপারভাইজার ছিলো ডেনিস সিয়ামা, আধুনিক মহাবিশ্বতত্ত্বের জনকদের একজন। তার সাথে কাজ করতে গিয়ে, প্রথমদিকে নিজের গণিতজ্ঞান নিয়েও ঠোকর খাচ্ছিলেন হকিং। আগেই বলেছি, তিনি অক্সফোর্ডে ছিলেন, আর সেখানে গণিতের জন্য উৎসর্গীকৃত বিভাগও ছিলো না তখন। তবু সাধারণ আপেক্ষিকতা আর মহাবিশ্বতত্ত্ব নিয়ে কাজ শিখে নিতে লাগলেন তিনি। ডেনিসও খুব ধৈর্য নিয়ে তার সাথে আলোচনা করতেন।
এমন সময় তার বোনের একটা বন্ধু জেইন ওয়াইল্ডের সাথে দেখা হলো তার। ফরাসি সাহিত্যে পড়ুয়া এই মেয়েটার সাথে খুব দ্রুত তার সখ্যতা গড়ে উঠলো এবং সেটা প্রেমেও গড়ালো। এই মেয়েটা না থাকলে হকিং হয়তো হকিং হয়ে উঠতেন না; কারণটা আমরা কিছুক্ষণ পরেই দেখবো।

মোটর নিউরন রোগ বা ALS

পেশী নাড়ানো যায় না, আস্তে আস্তে শরীর দুর্বল হতে থাকে, শারীরিকভাবে অথর্ব হয়ে পড়ে রোগী, কথা বলা অসম্ভব হয়ে যায়, খাবার গেলা যায় না, আস্তে আস্তে নিঃশ্বাসও আটকে যেতে থাকে – কারণ এই রোগে পেশী নাড়ানোর জন্য যে নিউরনগুলো দায়ী, সেগুলোর মৃত্যু ঘটতে থাকে আস্তে আস্তে। রোগের নাম মোটর নিউরন রোগ বা Amyotrophic lateral sclerosis (ALS). এই রোগে আক্রান্ত রোগী মারা পড়ে কয়েক বছরের মধ্যেই। আর সেই রোগে স্টিফেন হকিং আক্রান্ত হলেন মাত্র ২১ বছর বয়সে, ১৯৬৩ সালে। ডাক্তাররা বললো, হাতে আর দু বছরের মত সময় আছে। কোনো কোনো ডাক্তার বললো, ২৫ বছর পর্যন্ত বাঁচবেন না হকিং।
এটা জানার পর মানসিকভাবেও ভেঙে পড়লেন তিনি, পড়াশোনা ছেড়ে দিতে চাইলেন। ডাক্তাররা বললো, “ব্যস্ত থাকো, কিছু একটা নিয়ে লেগে থাকো। পড়াশোনাটা ছেড়ো না”। তার সুপারভাইজার ডেনিস সিয়ামাও বললেন, “এসো, আমি জানি, তুমি পারবে”। সবচেয়ে বড় খুঁটি হয়ে পাশে দাঁড়ালো সদ্য প্রেমিকা জেইন ওয়াইল্ড। বললো, “চলো, আমরা বিয়ে করে ফেলি”।
হকিং সেই সময়ের কথা রোমন্থন করে বলেছিলেন, “আমাদের বাগদান (এঙ্গেইজমেন্ট) আমাকে বেঁচে থাকার রসদ যুগিয়েছিলো”। ১৯৬৫ সালে দুজন বিয়েও করে ফেললেন।



মহাবিশ্বতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা


ঠিকমত কলমটাও ধরতে পারতেন না তিনি, যখন আবার গবেষণায় ফিরেছিলেন। তখনো তার ডক্টরাল থিসিসের বিষয় ঠিক হয়নি। তখন তিনি একটা বিষয়ে আগ্রহ খুঁজে পেলেন। রজার পেনরোজ তখন বেশ বিখ্যাত গবেষক ছিলেন। কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে তিনি চমৎকার কিছু কাজ করেছিলেন। বলেছিলেন, কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে নাকি স্থান-কালের অনন্যতা আছে। সহজ ভাষায়, এটার কেন্দ্রে গিয়ে স্থান আর কাল এমনভাবে অবস্থান করে যেন এটা অসীম, কিন্তু অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটা জায়গায়। অর্থাৎ, সেখানে সময় যেন থেমে আছে মহাকর্ষের টানে, আর একই টানে স্থানও বেঁকে গিয়ে ক্ষুদ্র হয়ে গেছে ধারণার অতীত একটা অবস্থানে। হকিং ভাবলেন, একই কাহিনী যদি গোটা মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়, তাহলে কেমন হয়?
জর্জ লেমিত্রে আর এডুইন হাবলের কল্যাণে বৃহৎ বিস্ফোরণ তত্ত্ব ততদিনে অনেক জনপ্রিয়। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জনপ্রিয়তার কথা না হয় আর নাই বললাম। এগুলোকে ভিত্তি হিসেবে ধরে তিনি তার থিসিস লেখা শুরু করলেন ১৯৬৫ সালে, Properties of extending universe অথবা “প্রসারণশীল মহাবিশ্বের বৈশিষ্ট্যগুলো”। ১৯৬৬ সালে সেটাকে অনুমোদন দেয়া হলো। পেনরোজ স্বয়ং তার থিসিস কমিটিতে ছিলেন। আমার মনে হয় না, ডেনিস তার পাশে খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে না থাকলে এত কিছু সম্ভব হতো। পিএইচডি জীবনে সুপারভাইজারই সবচেয়ে বড় কথা। ঐ অবস্থায় সুপারভাইজার যদি বলতেন, “আমি কোনো সাহায্য করতে পারবো না”, তাহলে সেই থিসিস কখনো আলোর মুখ দেখতো না।
সেই সময়টাতে চলাচলের জন্য হুইলচেয়ার ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না তার। বাকি জীবনটা হুইলচেয়ারেই কাটাতে হবে তাকে।

কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে গবেষণা + হকিং বিকিরণ + কৃষ্ণগহ্বর তথ্য বৈপরীত্য

পিএইচডি শেষে তিনি কেম্ব্রিজে পেনরোজের সাথেই কাজ শুরু করলেন। ১৯৭০ সালে পেনরোজ এবং তিনি মিলে প্রমাণ করে দেখালেন যে আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ড কোনো এক অনন্যতা থেকেই শুরু হয়েছে। একই বছরে তিনি কৃষ্ণগহ্বর নিয়েও আরো বিস্তৃত কাজ শুরু করলেন। তিনি প্রস্তাব করলেন যে, কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনাদিগন্ত বা ইভেন্ট হরাইজন (যেখানে ঢুকে গেলে আর মুক্তি নেই, গহ্বর আপনাকে শুষে নেবেই, সেটা) সময়ের সাথে ছোটো হয় না। অন্য গবেষকদের সাথে মিলে কৃষ্ণগহ্বরের ক্রিয়াকৌশল নিয়ে চারটা নীতি উত্থাপন করলেন ১৯৭০ সালে। ঘটনা দিগন্ত ছোটো না হওয়ার বৈশিষ্ট্যটা রাখলেন দ্বিতীয়তে। ১৯৭৩ সালে জর্জ এলিসের সাথে যুগ্মলেখক হিসেবে তিনি প্রথম বই প্রকাশ করলেন। নাম – The Large Scale Structure of Space-Time.
একই বছরে তিনি মহাবিরক্ত হয়ে খেয়াল করলেন যে কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে তার দেয়া দ্বিতীয় নীতিটা ভুল। কারণ কিছু রাশিয়ান গবেষকরা দেখিয়েছিলো যে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি অনুসারে ঘূর্ণনরত কৃষ্ণগহ্বর থেকে কণা নির্গত হবার কথা। হকিং গবেষণা করে দেখালেন যে, কাহিনী সত্য। ১৯৭৪ সালে তিনি বললেন, “কৃষ্ণগহ্বর থেকে বিকিরণ হয়, এবং এটা ততদিন চলবে, যতদিন এটার শক্তি শেষ না হয়, যতদিন এটা বিকিরণ করতে করতে উবে না যায়।” এই বিকিরণকে এখন হকিং বিকিরণ বা Hawking Radiation বলা হয়।
১৯৮১ সালে তিনি প্রস্তাব করেন যে, বিকিরণ করতে করতে যখন কৃষ্ণগহ্বর উবে যায়, তখন এর ভেতরের তথ্যগুলোও হারিয়ে যায়। কিন্তু তথ্য তো কখনো হারিয়ে যায় না। তাই, এটা নিয়ে পদার্থবিজ্ঞান জগতে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া (পড়ুন, যুক্তিপূর্ণ আলোচনা-সমালোচনা) শুরু হয়ে যায়। তথ্যসংক্রান্ত এই বৈপরীত্যের নাম Blackhole Information Paradox.

বাকশক্তি হারিয়ে ফেলা

১৯৮৫ সাল। হকিং তখন সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে, CERN এ গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। ভয়াবহ শারীরিক অবস্থা হয়েছিলো তার। লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিলো। যেহেতু রোগী কোমায় এবং তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ, তাই ডাক্তাররা তার স্ত্রী জেইনকে জিজ্ঞেস করলো, লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হবে কিনা। এই নারীর প্রচণ্ড মনোবলে হকিং সেই যাত্রায় বেঁচে ফিরে এসেছিলেন। জেইন হকিংকে কেম্ব্রিজে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তার সংক্রমণ ঠেকানো হয়। কিন্তু তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছিলেন না। তাই, হকিং এর শ্বাসনালী কেটে সেখানে টিউব বসানো হয়। ALS এর জন্য আগে এমনিতেই তার কথা জড়িয়ে যেতো, এবার তিনি সম্পূর্ণরুপে বাকশক্তি হারালেন।
প্রথমে কিছুদিন তিনি বানান কার্ড ব্যবহার করে যোগাযোগ করতেন। তাকে একটা একটা অক্ষর দেখানো হতো, তিনি যেটা বলতে চাইতেন, সেটাতে এসে থামলে ভ্রু উঁচু করতেন। পরবর্তীতে হকিং এর এক সহযোগী পদার্থবিদ ক্যালিফোর্নিয়ার একটা কোম্পানি Words Plus এ যোগাযোগ করলেন। এই কোম্পানি কম্পিউটার আর হাতের মধ্যে রাখা ক্লিকার ব্যবহার করে শব্দ আর বাক্য বানানোর মত সফটওয়্যার প্রযুক্তি বানিয়েছিলো। সেখানকার সিইও ওয়াল্টার ওয়োল্টজকে মার্টিন কিং বললেন, “এটা দিয়ে কি ALS এ আক্রান্ত ইংরেজ এক প্রফেসরকে সাহায্য করা যাবে?”
ওয়াল্টার সাহেব সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি স্টিফেন হকিং এর কথা বলছেন?”
কিং বললেন, “অনুমতি ছাড়া তার নামটা বলা যাবে না”।
পরের দিন অবশ্য তিনি ওয়াল্টারকে নিশ্চিত করেছিলেন যে এটা হকিং এর জন্যেই। ওয়াল্টার ALS এ আক্রান্ত শ্বাশুড়ির জন্য এটা বানিয়েছিলেন। তিনি জানিয়ে দিলেন, “যা যা দরকার, সবই পাঠিয়ে দেবো।”
এই সফটওয়্যারটাকে একটা ভয়েস সিনথেসাইজারের সাথে যুক্ত করে দিয়েছিলো Speech Plus নামের একটা কোম্পানি। এরপর থেকে মিনিটে পনেরোটার মত শব্দ বলতে পারতেন তিনি।

“কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” প্রকাশ

১৯৮২ সাল, ততদিনে হকিং এর তিন সন্তান খানিকটা বড় হয়ে গেছে। টাকাপয়সার কিছুটা টানাটানি শুরু হয়েছিলো। তিনি ঠিক করলেন, সর্বসাধারণের জন্য সাধারণ ভাষায় একটা বই লিখবেন। বইটার প্রথম খসড়া প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলো ১৯৮৪ সালেই, বাকশক্তি হারানোর এক বছর আগে। কিন্তু তার প্রকাশকের কাছে বইটা কঠিন মনে হওয়ায় (মানুষ বুঝবে না মনে হওয়ায়) আরো সহজ ভাষা ব্যবহার করতে বলেছিলেন।

সিনথেসাইজার দিয়ে কথা বলতে পারার সাথে সাথেই তিনি সেই কাজটা শুরু করলেন। তিনি যতই সহজ করেন, প্রকাশক সন্তুষ্ট হন না। দিন যায়, প্রকাশক বলতে থাকে, “এই জায়গাটা আরেকটু সহজ করো”। হকিং এর জন্য একই জিনিস বারবার দেখা আর লেখাটা খুবই কষ্টের হয়ে উঠছিলো। ব্যাপারটাকে তিনি সময়ের অপচয় বলে মনে করতেন। কিন্তু প্রকাশক পেছনে পড়েছিলো। অবশেষে ১৯৮৮ সালে বইটা প্রকাশিত হলো, প্রথম সংস্করণে ভূমিকা লিখে দিলেন খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান। বইটা ধুম মাচিয়ে দিলো সাথে সাথেই। এতদিনে প্রায় কোটির ওপরে কপি বিক্রি হয়ে গেছে।

ডিভোর্স, বিয়ে, এবং ডিভোর্স

বলতে গেলে ঐ সময়েই তিনি রাতারাতি সুপারস্টার হয়ে যান। আর হ্যাঁ, টাকাপয়সার সমস্যা আর কোনোদিন দেখতে হয়নি তাকে বা তার পরিবারকে। তবে ব্যক্তিগত জীবনে সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। দাম্পত্য জীবনে বেশ অসুখী ছিলেন তিনি। তাদের মধ্যে ভালোবাসা ছিলো ঠিকই, কিন্তু একসাথে থাকা আর সম্ভব হচ্ছিলো না।
১৯৯০ সালে, হকিং তার এক নার্সের সাথে থাকা শুরু করেন। ১৯৯৫ সালে জেইনের সাথে তার ডিভোর্স হয়ে যায়। আর সেই নার্সকে বিয়ে করেন হকিং। ২০০৬ সালের দিকে সেই সম্পর্কেরও ইতি টানেন তিনি। জেইনের সাথে পুনরায় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। জেইন আগে একটা বই লিখেছিলেন, Music to Move the Stars. ২০০৭ সালে সেটার একটা পরিমার্জিত রুপ বের করেন, Travelling to Infinity: My Life with Stephen.

স্বাস্থ্যের অবনতি

আস্তে আস্তে যে আঙুল দিয়ে ক্লিকার ব্যবহার করতেন, সেটাও অসাড় হয়ে যেতে লাগলো। ২০০৮ সালের দিকে, তার গ্র্যাজুয়েট এসিস্ট্যান্ট চশমায় ইনফ্রারেড লাগিয়ে গালের পেশীর নড়াচড়া দিয়ে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করলো। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটাও দুর্বল হয়ে যেতে লাগলো। ২০১১ এর দিকে, মিনিটে ১৫টার জায়গায় ২টা শব্দে এসে ঠেকলো তার যোগাযোগের গতি। তিনি ইন্টেলকে চিঠি লিখলেন, ওরা কোনো সাহায্য করতে পারবে কিনা জানতে চেয়ে। ইন্টেল একটা টিম পাঠালো, যাতে কম্পিউটার-হিউম্যান ইন্টারএকশন ডিজাইনার ছিলেন পিট ডেনম্যান। কাহিনীটা অদ্ভুত!
পিট ডেনম্যান নিজেও হুইলচেয়ার ব্যবহার করতেন। ঘাড় ভেঙে যাওয়ার পর যখন তাকে হুইলচেয়ারে আটকে পড়তে হয়েছিলো, তখন তার মা তাকে “কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” বইটা দিয়ে বলেছিলেন, “হুইলচেয়ারে বসেও মানুষ চমৎকার সব কাজ করতে পারে”। স্টিফেন হকিং ছিলেন পিট ডেনম্যানের প্রেরণা; আর তার প্রেরণার মানুষটা তাদের সাথে ৩০টা শব্দ বলতে ২০ মিনিট নিয়েছিলেন।

অনেক সাধনার পরে তারা এমন এক ব্যবস্থা করলেন যাতে তাকে কোনো শব্দ টাইপ না করতে হয়, বরং তিনি যাতে দেখানো শব্দগুলো থেকে দ্রত বাছাই করতে পারেন, তার গালের পেশী দিয়েই। বারবার তারা সেটার ইন্টারফেস পাল্টেছেন, যাতে তিনি অপেক্ষাকৃত দ্রুত শব্দ বাছাই করতে পারেন।

নিকটতম নক্ষত্রে মহাকাশযান পাঠানোর প্রজেক্ট

রাশিয়ান পদার্থবিদ+ব্যবসায়ী ইউরি মিলনার আর জুলিয়া মিলনার মিলে মহাকাশ গবেষণা ব্রেকথ্রু ইনিশিয়েটিভ নামক একটি সংস্থা স্থাপন করেছিলেন ২০১৫ সালে। এই প্রকল্পের একটা অংশ হচ্ছে নিকটতম নক্ষত্রে মহাকাশযান পাঠানোর জন্য। নিউ ইয়র্কের ওয়ান ওয়ার্ল্ড পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে জ্যোতিঃপদার্থবিদ স্টিফেন হকিং আর ইউরি মিলনার ২০১৬ সালের এপ্রিলের ১২ তারিখে ব্রেকথ্রু স্টারশটের ঘোষণা দিয়েছিলেন। মার্ক জুকারবার্গও তাদের এই প্রচেষ্টার, অর্থাৎ Breakthrough Starshot এর বোর্ডে যুক্ত হয়ে সমর্থন জানিয়েছেন। এই প্রকল্পের অধীনে খুব কম ওজনবিশিষ্ট একটা মহাকাশযান তৈরি করা হবে। এর ওজন হতে পারে এক গ্রাম। আর এটার সাথে লাগানো থাকবে lightsail. Lightsail হচ্ছে এমন একটা পাল যেটা আলোর ধাক্কায় চলে। আলোকপাল নিয়ে বিস্তারিত লিখেছিলাম যখন প্ল্যানেটারি সোসাইটি মহাকাশে সফলতার সাথে (২০১৫ সালে) তাদের প্রথম লাইটসেইল পাঠিয়েছিলো।

স্টিফেন হকিং এর ধর্মবিশ্বাস

আইনস্টাইনের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে অনেকে টানাহ্যাঁচড়া করে। আইনস্টাইন প্রচলিত কোনো ধর্মের ঈশ্বরে বিশ্বাস না করলেও বারংবার মহাবিশ্বের ঐকতানকে ঈশ্বরের নাম দিয়ে উক্তি দিয়েছেন। হকিং এর ধর্মবিশ্বাস নিয়ে টানাটানি করার কোনো সুযোগ নেই। অবশ্য সেটা সাম্প্রতিক সময়ে। একসময় তিনিও উদাহরণ দিতে গিয়ে ঈশ্বর শব্দটা ব্যবহার করেছেন। কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে তিনি লিখেছেন, “যদি কোনোদিন আমরা একটা পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব আবিষ্কার করতে পারি, সেটা হবে মানুষের যুক্তিক্ষমতার সর্বোচ্চ বিজয়- আর সেদিন আমরা ঈশ্বরের মন বুঝতে পারবো”। কেউ টানাটানি করতে চাইলে এই লাইনটা নিয়ে করতে পারে; যদিও একই বইতে তিনি লিখে দিয়েছিলেন, “মহাবিশ্বের উৎপত্তি বর্ণনা করার জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রয়োজন নেই”। ২০১৪ সালে এটাকে আরো খোলাসা করে বলেছেন, “ঈশ্বরের মন বুঝতে পারা বলতে আমি বুঝিয়েছি, যদি কোনো ঈশ্বর থেকে থাকে–যা আসলে নেই–তাহলে সেই ঈশ্বরের যা যা জানার কথা, আমরা তাই জানবো। আমি নাস্তিক”।
হকিং এও বলেছেন, “ধর্ম আর বিজ্ঞানের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। ধর্মের ভিত্তি কর্তৃত্ব ফলানোতে, আর বিজ্ঞানের ভিত্তি পর্যবেক্ষণ আর যুক্তিতে। জয় হবে বিজ্ঞানেরই, কারণ এটা কার্যকর”। স্বর্গ বা পরকালকে তিনি রুপকথার গল্প বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমাদের জীবন একটাই। এই এক জীবনেই ব্রহ্মাণ্ডের মহান নকশার কদর করতে হবে। আর সেই জীবন পেয়েছি বলে আমি কৃতজ্ঞ।”

তাকে নিয়ে বানানো মুভি, Theory of Everything

হকিং এর প্রথম স্ত্রীর লেখা বই Travelling to Infinity: My Life with Stephen এর কথা উল্লেখ করেছিলাম একটু আগে। সেটা দিয়ে একটা সিনেমা বানানো হয়েছিলো ২০১৪ সালে, Theory of everything. স্টিফেন সেই সিনেমাটা দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। হকিং এর ভূমিকায় এডি রেডমেইনকে দেখে তিনি মনে করেছিলেন যে তিনি যেন নিজেকেই দেখতে পাচ্ছেন।

সিনেমাটা আসলেই চমৎকার! আর এডি রেডমেইন একটা অস্কারও জিতে নিয়েছেন হকিং এর ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য।

মৃত্যু

তিনি জন্মেছিলেন গ্যালিলিওর মৃত্যুবার্ষিকীতে। আর মৃত্যুবরণ করলেন আইনস্টাইনের জন্মবার্ষিকীতে। ২০১৮ সালের ১৪ই মার্চ, স্টিফেন হকিং ইংল্যান্ডের কেম্ব্রিজে মৃত্যুবরণ করেন।
তার মৃত্যুর আগে কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করতো, “এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে মেধাবী মানুষটা কে?” – তাহলে সহজেই উত্তর দিতে পারতাম। কিন্তু এখন আর পারছি না। তার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে সাথে সাথে চোখ ঘোলা হয়ে গিয়েছিলো। তার স্মৃতিতে লিখেছিলাম –
প্রিয় স্টিফেন হকিং,
আমি আইনস্টাইনের সময়ে এই পৃথিবীতে ছিলাম না। যতদিন কার্ল সেগান বেঁচে ছিলেন, ততদিন ওনাকেও চিনতাম না। ফাইনম্যানের সময়েও না, নিউটনের সময়েও না। আমি এই পৃথিবীটা সজ্ঞানে ভাগাভাগি করেছি আপনার সাথে। আপনি আমাদের সময়ের সবচেয়ে মেধাবী পদার্থবিদ ছিলেন। সারাজীবন ব্যাপক পরিশ্রম করে আজ আপনি চিরবিদায় নিলেন।
আপনার এতদিন বেঁচে থাকার কথা ছিলো না। ডাক্তাররা দু বছরের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন সেই কত বছর আগে। মোটর নিউরন ডিজিজ এর শিকার হয়ে হুইলচেয়ারে আটকে পড়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকেই পুরো দুনিয়াটাকে জয় করে নিয়েছিলেন আপনি। Even from a wheelchair, you achieved a lot, more than a lot of us combined.
হকিং সাহেব, আপনার জীবন এবং কাজের প্রতি শ্রদ্ধা রইলো। Thank you for coming and living into this world.
সূত্র: বিজ্ঞান যাত্রা

আজ ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস

Detail

আজ ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। বাঙ্গালী জাতির এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। এর ২১৪ বছর পর পলাশির আম্রকাননের অদূরে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা আম্রকাননে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার প্রধানদের শপথের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল। শপথের সেই ৪১ বছরেরও মুজিবনগর দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজও মেলেনি।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দীন আহমদ ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ভারত গমনের সময় দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল রনাঙ্গণের নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এই এলাকার নিরাপত্তা ও ভৌগলিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর ১৪ এপ্রিল শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করেন। প্রথম দিকে চুয়াডাঙ্গাতে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ায় কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তনের ফলে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শপথ গ্রহণের স্থান চুয়াডাঙ্গার পরিবর্তে ইপিআর-উইং-এর অধিন মেহেরপুর সীমান্ত এলাকা বৈদ্যনাথতলা মনোনিত করা হয়।

দিনের পর দিন মুক্তিযোদ্ধারা মরণপণ যুদ্ধের পরেও স্বীকৃতি না পেয়ে যখন তাদের মনোবল ভাঙ্গতে শুরু করে ঠিক এমনই এক সংকটকালীন সময়ে ভারতীয় বিএসএফ’র উর্দ্ধতন কর্মকর্তা গোলক মজুমদার ও ৭৬ ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল চক্রবর্তী বৈদ্যনাথতলায় এসে স্থানীয় সংগ্রাম কমিটি এবং মেহেরপুরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী বিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিক-ই-এলাহী সহ আওয়ামী নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে বৈদ্যনাথ তলায় (বর্তমানে মুজিবনগর স্মৃতি সৌধ) জায়গা দেখিয়ে মঞ্চ তৈরীর প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বলেন।
আপামর জনতা স্বতঃস্ফুর্ত অংশ গ্রহনের মাধ্যমে ১৬ এপ্রিল সকাল থেকে সারারাত ধরে মঞ্চ তৈরী, বাঁশের বাতা দিয়ে বেস্টনি নির্মান এবং স্থানীয়ভাবে ভাঙ্গা চেয়ার টেবিল দিয়েই আয়োজন সম্পন্ন করেন। আনুসঙ্গিক সরঞ্জাম আসে ভারতের হৃদয়পুর বিএসএফ ক্যাম্প থেকে। অত্যন্ত গোপনিয়তার সাথে আয়োজন সম্পন্ন করা হয়।

১৭ এপ্রিল ১৯৭১, সেই মাহিন্দ্রক্ষণে তাজ উদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে সকাল নয়টার দিকে বৈদ্যনাথ তলায় পৌছান। ইতিমধ্যে দেশী বিদেশী শতাধিক সাংবাদিক এবং ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও আসেন। তার মধ্যে ছিলেন বিট্রিষ সাংবাদিক মার্ক টালি ও পিটার হেস। বহু প্রতিক্ষিত শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল এগারটায়।
মেজর আবু উসমান চৌধুরীর পৌছাতে বিলম্ব হওয়ায় ক্যাপ্টেন মাহবুব উদ্দীন আহমেদ ইপিআর আনছারের একটি ছোট্র দল নিয়ে নেতৃবৃন্দকে অভিবাদন জানান। অভিবাদন গ্রহণের পর স্থানীয় শিল্পিদের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সৈদয় নজরুল ইসলাম স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। গৌরিনগরের বাকের আলীর কোরআন তেলওয়াত এবং ভবরপাড়া গ্রামের পিন্টু বিশ্বাসের বাইবেল পাঠের মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। এরপরে আওয়ামীলীগের চিফ হুইফ অধ্যাপক শেখ মোঃ ইউসুফ আলী বাংলার মুক্ত মাটিতে স্বাধীনতাকামী কয়েক হাজার জনতা এবং শতাধিক দেশী বিদেশী সাংবাদিকের সামনে দাঁড়িয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা পত্র পাঠ করেন।
ঐতিহাসিক সেই স্বাধীনতার ঘোষনা পত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে চিফ হুইফ অধ্যাপক ইউসুফ আলী রাষ্ট্র প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে শপথ বাক্য পাঠ করান। এরপর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজ উদ্দীন আহমেদের নাম ঘোষনা করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরামর্শক্রমে মন্ত্রী পরিষদের সদস্য আইন, সংসদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে খন্দকার মোশতাক আহমদ, স্বরাষ্ট মন্ত্রী হিসেবে এএইচএম কামরুজ্জামান এবং অর্থ মন্ত্রী হিসেবে ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং শপথ পাঠ করান। এ অনুষ্ঠানে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত না থাকলেও বারবার উচ্চাররিত হয় তার নাম।
মন্ত্রী পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে কর্ণেল এম এ জি ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ পদে কর্ণেল আব্দুর রবের নাম ঘোষনা করা হয়। এরপরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দীন আহমেদ উপস্থিত সকলের সামনে ৩০ মিনিটের এক উদ্দিপনাময় ভাষন দেন। ভাষনে তিনি বলেন আজ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হবে এ বৈদ্যনাথতলা। এবং এর নতুন নাম হবে মুজিবনগর। তিনি ভাষনে বিশ্ববাসীর কাছে নতুন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দান ও সামরিক সাহায্যের আবেদন জানান।
বক্তৃত্বা এবং শপথ গ্রহণ পর্ব শেষে নেতৃবৃন্দ মঞ্চ থেকে নেমে এলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন মেজর আবু উসমান চৌধুরী। উপস্থিত জনতার মূহু মূহু জয়বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মুজিবনগরের আম্রকানন। সব মিলিয়ে ঘন্টা দু’য়েকের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বেই টানা নয়মাস যুদ্ধ শেষে লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলার স্বাধীনতা। বিশ্বের মানচিত্রে ঠাঁই করে নেয় স্বাধীন সার্বভৌম  বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সহ অনেকেই মুজিবনগর সরকারকে এদেশের মাদার সরকার বলে আখ্যায়িত করেছেন।



পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল

Detail
১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে কী অপরিসীম আত্মত্যাগ, অসীম সাহস ও বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের ইতিহাস প্রোথিত আছে, তা বুঝা যায় কবির গানে আর কণ্ঠে-


দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা


কারো দানে পাওয়া নয়,


দাম দিয়েছি প্রাণ লক্ষ কোটি


জানা আছে জগৎময় ...।


এই স্বাধীনতা প্রাপ্তির আগেও শত শত বছর এদেশের মানুষ লড়াই-সংগ্রাম করেছে অত্যাচারী শোষকের বিরুদ্ধে। একাত্তরের স্বাধীনতার ইতিহাস জানতে হলে সেই গৌরবোজ্জ্বল অতীতকেও আমাদের জানতে হবে। দুশ' বছর শাসন করেছে ইংরেজ বেনীয়া গোষ্ঠী। তার পূর্বে আর্য সভ্যতা, গৌতম বুদ্ধ, জৈন, গ্রীক, মৌর্য, কুষান, গুপ্তসাম্রাজ্য, পালবংশ, সেনবংশ, সুলতানাতযুগ, মুঘল সাম্রাজ্যের পর বৃটিশ শাসনের সেই দুশ' বছরের গোলামীর জিঞ্জির থেকে বের হয়ে আসতে হলে সংগ্রাম আর আন্দোলন সৃষ্টি করেই আসতে হবে। তাই ভারত বর্ষের মাটি থেকে বৃটিশদেরকে তাড়াতে আরম্ভ হলো সংগ্রাম-আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন। পরাধীন ভারতের স্বাধীনতার জন্য অনেক রক্ত ঝরেছে। দীপান্তর, ফাঁসি, জেল খেটেছে বহু নেতা-কর্মী। ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, বিনয় বাদল দিনেশ, সিরাজউদ্দৌলা, তিতুমীর আরও অনেককে। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করা হয়। তখন পাকিস্তান, ভারত, বঙ্গদেশ নিয়ে একসঙ্গে ভারতবর্ষ। ব্রহ্মাদেশকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু এতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি। শাসন কর্তা সম্পূর্ণ ইংরেজ বেনীয়া গোষ্ঠী। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসনের সর্বশেষ ভারতবর্ষ শাসন করলেন মাউন্ট ব্যাটেন। তিনি এসেই দেখলেন হিন্দু-মুসলিম এ দুটি জাতির মধ্যে পরিপূর্ণ ব্যবধান রয়েছে। এ দু জাতির মধ্যে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা করে তিনি এক পরিকল্পনার সুপারিশ করলেন, ভারত বিভাগ করলে ভালো হবে। এ পরিকল্পনা 'মাউন্ট ব্যাটেন পরিকল্পনা' বা ৩রা জুন পরিকল্পনা নামে খ্যাত। এটি ভারতবর্ষের কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও শিখ সম্প্রদায় গ্রহণ করলো। কুখ্যাত মাউন্ট ব্যাটেন বিভেদের বীজ ঢুকিয়ে দিলেন। ইংরেজদের এই নকশা বহু পূর্ব থেকেই চলছিল এমন-১৯৪০ সালে লাহোরে এক বৈঠকে ভারতবর্ষের অঞ্চলগুলোতে মুসলমান বেশি সে রকম দুটি অঞ্চলকে নিয়ে দুটি দেশ এবং বাকি অঞ্চল নিয়ে একটি দেশ তৈরি হবে। কিন্তু দার্শনিকেরা মনে করেন, শুধু ধর্ম এক হলেই দুটো জাতি এক হয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না। তা যদি হতো তাহলে ইরাক, আরব, মিশর এসব দেশ মিলে এক দেশ হলো না কেন? ইউরোপের অধিকাংশ রাষ্ট্র তো খ্রিস্টান ধর্মের মানুষ। তারাতো একদেশ হয়ে যায়নি। পৃথিবীতে এমন বিচিত্র দেশের উদাহরণ আর নেই। তারপরেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আশা করেছিল, একবার অন্তত একটু শান্তি পাবো, পাকিস্তানের শাসকেরা ইংরেজদের মত শোষক, অত্যাচারী হবে না। জননেতা মহাত্মা করম চাঁদ গান্ধী ভারত ভাগ হবে তা তিনি চাননি। রাজনৈতিক নেতারা বিশেষ করে কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী প্রমুখ মুসলিম রাষ্ট্র তৈরিতে সোচ্চার ছিলেন। এই ভুলের মাশুল তার দেশকে দিতে হয় ১৯৭১ সালে। আজ পাকিস্তানের একটি ডানা ভেঙ্গে গেছে। নিজ ভূমে আরো অধিক অশান্তি চলছে।


ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে গেল। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান এক পাকিস্তান, এক জাতি মুসলিম জাতি, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র তৈরি হলো। আর হিন্দু রাষ্ট্র ভারত। কিন্তু ভারতের গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে পথ চলতে থাকে। আর পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র, গণতন্ত্র অনুপস্থিত, ধর্ম নিরপেক্ষতা অনুপস্থিত। রাষ্ট্র চলছে যেনতেন ভাবে, অশান্তির বীজ দিন দিন দানা বাঁধছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ধর্ম ইসলাম হলেও জাতি সত্তায় কিন্তু উর্দুভাষী ও বাংলাভাষী। দুই পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে সামাজিক, ভাষা, আচার, আচরণে দূরত্ব অনেক বেশি। সম্পদেও অনেক ব্যবধান। লোক সংখ্যায় দেখা যায় পাকিস্তানে দুই কোটি আর পূর্ব পাকিস্তানে চার কোটি। স্বাভাবিক ভাবেই পূর্ব পাকিস্তানে ব্যবসা, বাণিজ্য, পুলিশ মিলিটারী সব কিছুতেই বেশি। পাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতাদের মাথায় পোকা ঢুকতে আরম্ভ করলো। তারা পূর্ব পাকিস্তানে শোষণের চিন্তা ভাবনায় প্রথমেই আঘাত করলো বাংলা ভাষার উপর। রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। বাঙালির বাংলা ভাষা মাতৃভাষা নয়।


১৯৪৮ সাল থেকে বাঙালি জনতা এর প্রতিবাদ করতে করতে চলে এলো ১৯৫২ সালে। রাষ্ট্র ভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনতা পূর্ব বাংলায় এক হয়ে এক দাবিতে মাঠে নেমে পড়লো। আন্দোলন, জেল খাটা, সংগ্রাম চলতে থাকে। ধীরেন দত্ত, একে ফজলুল হক, সোহরাওয়ারদী, মোজাফ্ফর, মনিসিং, শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা ভাসানী, জিল্লুর রহমান প্রমুখ জাতীয় নেতৃত্বও রাজপথে নেমে পড়লেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এই ভাষা সংগ্রামে প্রাণ বলিদান হলো রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত আরো অনেকের। সারা পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানীদের উর্দুভাষী পুলিশ-মিলিটারীদের অত্যাচার নির্যাতন বেড়ে গেল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অশনি সংকেত দেখা দিল। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট তৈরি করলো পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা। জয়ী হলো যুক্তফ্রন্ট। আন্দোলন চলছে। ১৯৫৮ সালে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে আইয়ুব খান এলেন সামরিক শাসক হিসেবে বন্দুকের নল বাঙালির বুকে ধরে। একদিকে সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার, অন্যদিকে অত্যাচার। সংগ্রামে বাঙালি জাতি ভয় পায় না। ১৯৬১, '৬২, '৬৯ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক আন্দোলন চলে। রাজনৈতিক অগ্রদূত সকলের গ্রহণযোগ্য নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এগিয়ে চলছেন। এই জাতিকে মুক্ত করতে হবেই। রাজনৈতিক নেতাদের ৬ দফা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা নিয়ে চলতে চলতে এক দফায় পরিণত হলো-নির্বাচন চাই। ১৯৭০ সালে নির্বাচন দিতে বাধ্য হলো। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়ী হলো। কিন্তু নির্বাচনের পর বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা দিতে চাচ্ছিলো না। টালবাহানা আরম্ভ হলো। এবার আবার সংগ্রামে মাঠে নামতে হলো। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ বাংলার স্বাধীনতা ও সর্বভৌমত্বের চিন্তা চেতনায় বাংলাদেশের একটি হলুদ মানচিত্র খচিত সবুজ জমিন নিয়ে পতাকা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আ.স.ম. আব্দুর রব অপরাহ্নে পল্টন ময়দানে উত্তোলন করেন এবং সর্ব প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ঘোষণাপত্র প্রচার করেন জনাব শাহজাহান সিরাজ। এই জনসভায় বঙ্গবন্ধু উপস্থিত বক্তব্য রাখেন। ২ মার্চ ১৯৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের ঐতিহাসিক ছাত্রসভাতে এই পতাকা প্রথম উত্তোলন হয়। তা উত্তোলন করেন আ.স.ম. আব্দুর রব নিজেই। সংগ্রাম তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু উপাধি পেলেন ছাত্রদের পক্ষ থেকে। শেখ মুজিব পাকিস্তানী জান্তাদের সাথে কয়েক দফা বৈঠক করেন। কিন্তু তারা কিছুতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। কৌশলে বাঙালিকে হতা করে শ্মশানে পরিণত করতে রসদ ও সৈন্যবাহিনী রাতের অন্ধকারে নিয়ে আসতে থাকে। সোয়াত জাহাজে অস্ত্র গোলাবারুদ সৈন্যবাহিনী চট্টগ্রাম বন্দরে ভীড়তে থাকে। মেজর জিয়া অস্ত্র খালাস কাজে তদারকিতে ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগের এম.এন.এ. জনাব আবদুল মান্নানের কথায় চলে আসেন চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্রে (কালুর ঘাট) এবং বঙ্গবন্ধুর হয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যাতে বাঙালি সৈন্য বাহিনী ও জনতা পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমান আর ফিরে যাননি পাকিস্তানি জান্তাদের সাথে। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের ১নং সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্বে চলে যান।


১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (রেসকোর্স ময়দানে) ঐতিহাসিক এক ভাষণে ঘোষণা করেন-


'এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম


এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'


মুক্তিকামী জনতা স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে প্রস্তুতি নিতে থাকে। মানুষ নিধনযজ্ঞ আরম্ভ হয়ে গেল। পাক বাহিনীর সাথে যোগ দিল বিহারী, পাঞ্জাবী। বাঙালির ঘরে ঘরে আগুন, লুট, ধর্ষণ, হত্যা চলতে লাগলো। বাঙালি সেনারা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিল। ২৫ মার্চ ৭১ পাকিস্তানী বাহিনী শুরু করলো ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা। পাকিস্তানী বাহিনী কামান, ট্যাংক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর উপর। রাত গভীর হলে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা বেতারযন্ত্রে তারবার্তার মাধ্যমে প্রেরণ করেন। ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সারাদেশে মানুষকে আলোড়িত করেছিল। সেই ২৬ মার্চের রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে জানা যায় তিনি পাকিস্তানে কারাগারে বন্দী। মুক্তিযুদ্ধ চলতে থাকে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য উদিত হলো ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল। একটি পতাকা একটি ভূখ- বাঙালি ফিরে পেল লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরিয়ে আনা হলো বাংলার মাটিতে ১৯৭২ সালের মিত্রবাহিনী ভারতের সহযোগিতায়।


স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে জনতা এগিয়ে চলতে থাকে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর ৩২নং ধানমন্ডির বাড়িতে ১৫ আগস্ট একটি কুচক্রী মহল স্বাধীনতার বিপক্ষের কিছু কুলাঙ্গার হঠাৎ বঙ্গবন্ধুকে তাঁর পরিবারসহ হত্যা করলো। স্বাধীন দেশের চাকা ঘুরে যায়। শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা দুই বোন বেঁচে যান বিদেশে লেখাপড়ায় থাকাতে। পরবর্তীতে চড়াই উৎরাই পার করে বাংলাদেশে এসে আওয়ামীলীগ পুনর্গঠন করে দেশমাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। স্বাধীনতার স্বাদ ঘরে ঘরে পৌছে দিতে হবে, জনতার মুখে হাসি ফুটাতে হবে এই প্রত্যয়ে জনতাকে নিয়ে পিতৃহত্যার বিচার, জঙ্গিদমন, রাজাকার আলবদরসহ দেশীয় সকল দোসরকে দমন করতে সংগ্রামে নেমে পড়েন। এখনো কূটকৌশল চলছে। চলছে স্বাধীনতা প্রাপ্তির ৪৭ বছর। স্বাধীনতার লালসূর্য উদিত হবে ২৬ মার্চ প্রতিটি বছরের মতো। এবারের অঙ্গীকার হবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করা, জঙ্গি রাজাকার মুক্ত বাংলাদেশ, মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা, একটি স্বচ্ছ গণতন্ত্রের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।





লেখক পরিচিতি : পীযূষ কান্তি রায় চৌধুরী

উপজেলা বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তি ক্লাব

Detail
সংস্থার নামঃ উপজেলা বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তি ক্লাব
সংস্থার ঠিকানাঃ বদলগাছী, নওগাঁ।
কর্মএলাকাঃ বদলগাছী উপজেলা
সংস্থার উদ্দেশ্যঃ
১। উপজেলার জনসাধারণকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে সচেতন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহন করা।
২। উপজেলার সকল পর্যায়ের নাগরিকগনকে বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তি বিষয়ে বাস্তব ধারনা প্রদান এবং সর্বস্তরের বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তিকে জন প্রিয় করে তোলা।
৩। জনগনকে কৃষি, স্বাস্থ্য সহ দৈনন্দিন জিবনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করা, এবং এতদ্ব সংক্রান্ত বিষয়ে স্থানিয় সমস্যা চিহ্নিত করে ক্লাবের মাধ্যমে সমাধানের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহন করা।
৪। শিশু কিশোর তরুন উদ্যোগী সকলকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ধর্মীয় উদ্ভাবনীমূলক কাজে সার্বিক সহযোগীতা ও উৎসাহ প্রদান।
৫। বিজ্ঞান মেলা , বিজ্ঞান প্রদশর্নী, বিজ্ঞান বিষয়ক চলচিত্র প্রদর্শনী ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিযোগীতা সহ নানা বিধ প্রতিযোগীতার আয়োজন করা।
৬। বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তি বিষয়ে কৃতি ব্যক্তিদের উৎসাহ ও পুরস্কৃত করা।
৭। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভিত্তিক বিভিন্ন আলোচনা সভার আয়োজন করা এবং বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তি বিষয়ে বিভিন্ন প্রকাশনার ব্যবস্থা করা।
৮। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে শিশু কিশোরদের মেধা বিকাশের সহায়তার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তি বিষয়ে জাদুঘর , বিজ্ঞান গবেষনাগার এবং লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা।
৯। সৌরজগত তথা মহাকাশ বিষয়ে জনগনের মধ্যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করা।
১০। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভিত্তিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকার সেবা মূলক প্রকল্প প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন ।
১১। উপজেলার অন্তর্গত বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ক ক্লাবকে শাখা ক্লাব হিসাবে তালিকা ভূক্ত করণ এবং শাখা ক্লাব সমূহকে বিভিন্ন সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান এবং সকল ক্লাবের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে উপজেলায় বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা তরানিত্ব করা।
১২। উপজেলায় বিজ্ঞান বিষয়ক সরকারী নীতিমালা সুষ্ঠ বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা করা।
১৩। জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমান বিজ্ঞান প্রদর্শনীর আয়োজন করা।
১৪। জেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তি সপ্তাহের কার্যক্রমে অংশ গ্রহন।

আইসিটি বিষয়ের ব্যবহারিক থাকা জরুরি

Detail

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে নতুন শিক্ষাক্রম চালু  হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা হবে ১২০০ নম্বরের পরিবর্তে ১৩০০ নম্বরের ভিত্তিতে। শিক্ষাক্রমে ২০০ নম্বরের ঐচ্ছিক কম্পিউটার শিক্ষার পরিবর্তে ১০০ নম্বরের আবশ্যিক ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ (আইসিটি) বিষয় সংযোজিত হয়েছে, যা ছয়টি শাখার শিক্ষার্থীদের জন্যই আবশ্যিক। সরকারের এ উদ্যোগ অত্যন্ত  সময়োপযোগী বলে মন্তব্য  করেছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশেষজ্ঞ। বিশেষ করে সবার জন্য তথ্য ও  যোগাযোগ প্রযুক্তি আবশ্যিক করায় শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে আরও বেশি স্বাবলম্বী হবে।
একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ  মোকাবিলায় আইসিটি পৃথিবীর দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্যে খুলে দিয়েছে  অপার  সম্ভাবনার  দুয়ার।  বর্তমান সরকার  তথ্য ও যোগাযোগ  প্রযুক্তির গুরুত্ব উপলব্ধি করে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন; যা আমাদের জন্য অত্যন্ত আশার কথা। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার মূল  যে হাতিয়ার তা হচ্ছে তথ্য ও  যোগাযোগ  প্রযুক্তি।  আর এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার  করার জন্য দরকার  দক্ষ আইসিটি জ্ঞানসম্পন্ন মানব সম্পদ।
দক্ষ মানব সম্পদ তৈরির জন্য দরকার ব্যবহারিকসহ  উপযুক্ত কম্পিউটার শিক্ষার। কিন্তু কম্পিউটার শিক্ষায় ব্যবহারিক বাদ দিয়ে আইসিটি এর প্রয়োগ সম্ভব নয় বলে অনেকে মনে করেন।  শুরু থেকে আবশ্যিক হওয়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে ব্যবহারিক এবং নম্বর বন্টন বিষয়ে কোনো দিক নির্দেশনা না থাকলেও এনসিটিবিতে লেখকদের নিয়ে বৈঠকে এ বিষয়ে অবশ্যই প্রাকটিক্যাল থাকবে এবং এর জন্য নম্বর বরাদ্দ হলো ২৫ যা মৌখিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে লেখকরা তাদের বইয়ের পান্ডুলিপি  তৈরি করে এনসিটিবি থেকে অনুমোদন নিয়ে প্রকাশ করেছে।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে ইতোমধ্যে ব্যবহারিকসহ নাম্বার বন্টনের বিষয়টি সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেছে। কিন্তু এনসিসিটিবি থেকে এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানা যাচ্ছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো পরিপত্র জারি হয়নি। রাজশাহী ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষা বোর্ডেও এ ব্যাপারে তথ্য প্রকাশ করেনি। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবেসাইটে এ বিষয়ে প্রকাশ হওয়ায় তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এনসিটিবির একাধিক কর্মকর্তা বলে জানা গেছে।
নতুন করে আবশ্যিক হওয়া এ বিষয়টি নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন, উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যায়। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে তাদের প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে। যেসব শিক্ষার্থীরা কোনো দিন কম্পিউটার স্পর্শ করেনি তারা এ যন্ত্রটির স্পর্শে আসার আনন্দ উদ্দীপনায় বিভোর।
তবে হঠাৎ করেই শোনা যাচ্ছে এ বিষয়ে ব্যবহারিক থাকবে না। সারা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ল্যাব নেই, বিদ্যুৎ নেই ইত্যাদি অজুহাতে ব্যবহারিক উঠিয়ে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। যা একটি আনন্দ আয়োজনের মধ্যে হঠাৎ বিষাদের ছায়া ফেলেছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়েছেন উদ্বিগ্ন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মানে কম্পিউটার। আর কম্পিউটার মানে এর অ্যাপ্লিকেশন তথা ব্যবহার। এ বিষয়ে ব্যবহারিক থাকবে না বিষয়টি অনেকে মেনেই নিতে পারছেন না। এ বিষয়ে ব্যবহারিক থাকার আবশ্যকতা প্রসঙ্গে নিচে কিছু আলোচনা করা হলো।
পূর্বে ২০০ নাম্বারের কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়টিতে ১ম পত্র এবং ২য় পত্র মিলে ব্যবহারিক ছিল ৮০ নাম্বার (যা বর্তমানে সাচিবিক বিদ্যায় রয়েছে)। মূলত প্র্যাকটিক্যালের জন্যই শিক্ষার্থীরা এ বিষয়টি নিতে বেশি আগ্রহী হতো। প্র্যাকটিক্যাল থাকাতে তারা ল্যাব ব্যবহার করে কম্পিউটার অপারেশনের মৌলিক বিষয়গুলো শিখতে পারতো। আর প্র্যাকটিক্যাল এর নাম্বার যেহেতু শিক্ষকদের হাতে থাকে তাই শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রাখা, শিক্ষকদের কথা শোনা, বেশি বেশি ক্লাশে হাজির হওয়া ইত্যাদি অনেকটা বাধ্য হয়েই করতো। কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল না থাকলে শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগই ক্লাশে হাজির হবে না বলে অনেক শিক্ষক  মনে করেন। আর এতে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আইসিটিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রক্রিয়া অনেকটাই ব্যাহত হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ বিবিএ অনার্স (হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, মার্কেটিং, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং), বিএসএস অনার্স (অর্থনীতি), বিএসসি অনার্স (পরিসংখ্যান), সমাজকর্ম বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ১০০ নম্বরের কম্পিউটার  অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজী বিষয়টি বাধ্যতামূলক হিসেবে রয়েছে। কিন্তু এতে ব্যবহারিক না থাকায় শিক্ষার্থীরা ক্লাসে একেবারেই কম উপস্থিত থাকে যা অনেক সময় শিক্ষকদেরকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে।
মাধ্যমিক স্তরে কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক না করে কম্পিউটার পরিচিতি বা প্রাথমিক পরিচালনার জ্ঞান ব্যতীত কোন শিক্ষার্থীকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সরাসরি ওয়েব পেজ ডিজাইন, এইচটিএমএল বা সি প্রোগ্রামিং বিষয়টি থাকাতে গ্রামগঞ্জের সাধারণ শিক্ষার্থীরা কতটুকু পারবে সে বিষয়টি নিয়ে অনেকে উদ্বিগ্ন। যে কোন বিষয় চালু হয়ে গেলে প্রথম দিকে একটু অসুবিধা হলেও পরবর্তীতে ঠিক হয়ে যেতে দেখা যায়। তাই যেহেতু ধারাবাহিকতা ভেঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিকে হঠাৎ করে আইসিটি বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তাই প্রথমদিকে বোর্ড তাদেরকে নাম্বার দেয়ার ব্যাপারে উদার থাকবে এবং প্রাথমিক পর্যায়ের উক্ত বিষয়গুলো ল্যাবে না করেও অনেকটা চালিয়ে দেয়া যায় বলেও অনেকে মন্তব্য করেছেন। এছাড়াও পূর্বের ২০০ নাম্বারের কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ের প্রাকটিক্যালে উক্ত বিষয়গুলো থাকার পরও শহরের ভাল কয়েকটি কলেজ ছাড়া গ্রামেগঞ্জের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ল্যাবে প্র্যাকটিক্যাল করা ছাড়াই (যাদের কথা ভেবে আমরা উদ্বিগ্ন) ভালভাবে পাশ করতে দেখা গেছে। বর্তমানে সরকারি সব কলেজ এবং বেসরকারী প্রায় সব কলেজেই কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল এর তত্ত্বাবধানে দেশে ১২৮ টি ডিজিটাল ল্যাব রয়েছে। উন্নত কম্পিউটার, প্রজেক্টর, ইউপিএস এবং এয়ার কন্ডিশনসমৃদ্ধ এসব ল্যাবে যেসব প্রতিষ্ঠানে ল্যাব সুবিধা নেই সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরকে গ্রুপ গ্রুপ করে উচ্চ মাধ্যমিকের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের ব্যবহারিক অংশটি দেখানো যেতে পারে। স্ব-স্ব কলেজের ল্যাবের পাশাপাশি এসব ল্যাবে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদেরকে স্বল্প মেয়াদি কম্পিউটার অপারেশন কোর্স করানোর মাধ্যমে আইসিটি বিষয়টি ভালভাবে পড়ানোর উপযুক্ত করে গড়ে তোলা যেতে পারে। আইসিটি বিষয়টি বাধ্যতামূলক  হওয়ায়  এবং  এতে  ব্যবহারিক  থাকায়  যেসব  কলেজে  কমপিউটার  ল্যাব  নেই  সেসব  কলেজের শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়বে। ১৫০-২০০ শিক্ষার্থীর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়ার জন্য আইপিএসসহ দুই লক্ষ টাকার মধ্যে একটি  কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করা যায়।
বর্তমানে অনেক কলেজ হওয়ায় এবং শিক্ষার্থী পাওয়ার ব্যাপারে কলেজগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকায় কলেজ ব্যবস্থাপনা  কমিটি বাধ্য হয়ে দ্রুত কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠিত করবে। কলেজের নিজস্ব ফান্ড না থাকলে স্থানীয় সংসদ সদস্য, শিল্পপতি, এনজিও এবং কম্পিউটার কাউন্সিল এর সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। আর এভাবে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের মাধ্যমে ডিজিটাল ডিভাইড দূরীকরণের পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরির স্বপ্ন বাস্তবায়নে সুবিধা হবে।
সরকারি কলেজগুলোতে বিশেষ করে মফস্বল এলাকার সরকারি কলেজগুলোতে উচ্চ মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রাইভেট কলেজগুলোর তুলনায় অনেক বেশী। সরকারি কলেজে বিশেষ করে কমার্স বিভাগের শিক্ষার্থীরা উচ্চ মাধ্যমিকে আগেও কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়টি নিতো। কিন্তু বর্তমানে সবার জন্য আবশ্যিক হওয়াতে শিক্ষার্থী
সংখ্যার তুলনায় ল্যাবে কম্পিউটার সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। কিন্তু প্র্যাকটিক্যালের জন্য পূর্বে বরাদ্দকৃত নাম্বারের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনুপাতে এ সংখ্যায় কোন অসুবিধা নেই। বিষয়টি আরো পরিষ্কার করে বোঝা যাবে ধরা যাক বর্তমানে প্র্যাকটিক্যালের জন্য নাম্বার বরাদ্দ হলো ২৫, পূর্বে কম্পিউটার শিক্ষা ১ম এবং ২য় পত্রের জন্য বরাদ্দকৃত নাম্বার ছিল ৮০। অর্থাৎ বর্তমানে বরাদ্দকৃত নাম্বারের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি। বর্তমানে যদি পূর্বের কম্পিউটার শিক্ষার শিক্ষার্থীদের সংখ্যা পূর্বের চেয়ে তিনগুণ বেশিও হয় তাহলে ল্যাব ব্যবহারে অসুবিধা হবে না।
বর্তমান তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে ছয়টি অধ্যায় রয়েছে। এ ছয়টি অধ্যায়ের মধ্যে তিনটি অধ্যায়ে ব্যবহারিক রয়েছে। এ তিনটি অধ্যায়ের  মধ্যে আবার তত্ত্বীয় অংশের সাথে তুলনা করলে ল্যাবে করতে হবে এরকম ব্যবহারিক বিষয় হলো এক তৃতীয়াংশ। সে হিসাবে বলা যায় মোট ছয়টি অধ্যায়ের মধ্যে মাত্র একটি অধ্যায় ব্যবহারিক। তাই আরো দেড় বছর পরে ব্যবহারিক শুরু করলেও কোন অসুবিধা হবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানে এখনো পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা নেই তারা উক্ত দেড় বছরের মধ্যে পর্যাপ্ত সুবিধাসম্পন্ন ল্যাব তৈরি করে নিতে পারে। বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে ব্যবহারিক হিসাবে থাকা সি প্রোগ্রামিং, এইচটিএমএল এবং ডেটাবেজ প্রোগ্রামিং বিষয়গুলো করতে উচ্চ কনফিগারেশনের কম্পিউটারের প্রয়োজন নেই। আট নয় হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায় এমনসব কম্পিউটার দিয়ে এ বিষয়গুলোর ব্যবহার দেখানো যায়। তাই কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য ল্যাব তৈরি আগের চেয়ে অনেক সহজ।
তথ্য প্রযুক্তি বিষয়টি আবশ্যিক হওয়াতে বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার কোচিং সেন্টারগুলোতে ব্যবহারিক দেখানোর জন্য ব্যক্তি উদ্যাগে কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করা হয়েছে। যদি কোন প্রতিষ্ঠান ল্যাব সুবিধা দিতে না পারে তাহলে শিক্ষার্থীরা স্বল্প টাকায় এ ধরনের কোচিং সেন্টারগুলোর সার্ভিস নিয়ে ব্যবহারিক অংশটি করতে সম্ভব হবে। সারা বাংলাদেশ বিবেচনা করলে দেখা যাবে মাত্র ১-৫% প্রতিষ্ঠান উচ্চ মাধ্যমিকে থাকা ব্যবহারিক করানোর মতো অবকাঠামো নেই। বাকি ৯৫% প্রতিষ্ঠানেই এই সুবিধা রয়েছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তথ্য প্রযুক্তি বিষয়টির ব্যবহারিক অংশটি উৎসাহের সাথে করছে। তাই মাত্র কয়েক পারসেন্ট প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা করে বাকি ৯৫% শিক্ষার্থীদেরকে বঞ্চিত করা কি ঠিক হবে? সরকারের পক্ষ থেকে সারা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ এবং প্রজেক্টর দেয়া হচ্ছে। একটি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থীদেরকে কোন বিষয়ে ভালভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের উপর ভিডিও লার্ণিং সিডি বের হয়েছে। সিসটেক পাবলিকেশন্সের পক্ষ থেকে শিক্ষকদেরকে এসব সিডি ফ্রি বিতরণ করা হচ্ছে। সিডিতে ব্যবহারিক অংশটি হাতে কলমে শিখানো হয়েছে। এর মাধ্যমেও এ বিষয়টি শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ হয়েছে।
যেহেতু উচ্চ মাধ্যমিকের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টি অর্থাৎ কম্পিউটার বিষয়টি চালু করা হয়েছে তাই কোনভাবেইএর ব্যবহারিক অংশটি বাদ না দেয়ার দাবি বিজ্ঞ মহলের। কম্পিউটার মানেই প্র্যাকটিক্যাল। সারা দেশের কথা বিবেচনা করে প্রয়োজনে প্রথম বছর পরীক্ষা সহজ করা যেতে পারে। যেমন সি এর একটি ছোট প্রোগ্রাম রান করানো, নোটপ্যাড চালু করে এইচটিএমএল এর এক দুইটি ট্যাগের ব্যবহার এবং ডেটাবেজ অংশে একটি টেবিল তৈরি করে তাতে কয়েকটি রেকর্ড সন্নিবেশিত করা এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। ২৫ নাম্বারের মধ্যে এসব ব্যবহারিক কাজের জন্য ১০ নাম্বার বাকি ব্যবহারিক এর সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু তাত্ত্বিক অংশ, মৌখিক এবং প্রজেক্ট লেখা। এভাবে করলে কোন শিক্ষার্থীই খারাপ করবে না। একেবারে রিমুট এলাকার শিক্ষার্থীদেরকে প্রয়োজনে ঐ ১০ নাম্বার এমনেতেই দিয়ে ব্যবহারিক করার  মতো ল্যাব না থাকার বিষয়টি কভার করা যেতে পারে।
উচ্চ মাধ্যমিকের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তথা কম্পিউটার বিষয়ে যদি প্র্যাকটিক্যাল না থাকে তাহলে অনেক শিক্ষার্থী হয়তো কম্পিউটার স্পর্শই করতে পারবে না। যদি প্র্যাকটিক্যাল থাকতো তাহলে যেভাবেই হউক একজন শিক্ষার্থী হয়তো কোন না কোন ভাবে একদিনের জন্য হলেও কম্পিউটার ব্যবহার করে দেখার সুযোগ পেতো। যেমন, প্রযুক্তির আলো নামের একটি ভলেনটিয়ার প্রতিষ্ঠান যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ল্যাব নেই তাদের শিক্ষার্থীরা যাতে হাতে কলেমে শিখতে পারে সেজন্য উদ্যাগ নিয়েছেন। তাদের মতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি হাতেকলমে শিখতে পারলে ভালোভাবে বিষয়টি বুঝার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ওয়েব ডেভলপমেন্ট এবং প্রোগ্রামিং  এর প্রতি আগ্রহী হতো। প্রযুক্তি ছড়িয়ে যাক সবখানে এ শ্লোগান নিয়ে কার্যক্র শুরু করেছে প্রযুক্তিআলো। বিভিন্ন পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের তরুণ শিক্ষার্থীরা সমাজের প্রতি দ্বায়বদ্বতা হিসাবে বলেন্টারি মানসিকতা নিয়ে প্রযুক্তি আলোর সদস্য হিসাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদেরকে হাতেকলেমে শিক্ষা দেয়ার উদ্যোগের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। তাদেরকে নিয়ে একটি টীম গঠন করা হয়েছে। এ টীমের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ নিয়ে সরাসরি শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রযুক্তি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিবে। এভাবে সরকারিভাবে উৎসাহিত করলে অনেক প্রতিষ্ঠানই এগিয়ে আসবে। সরকার যদি সব পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলোর শিক্ষার্থীদেরকে উৎসাহিত করে তাহলে তাদের নেতৃত্বে স্থানিয় প্রসাশনের সহায়তায় প্রত্যন্ত এলাকায় ক্যাম্প করে শিক্ষার্থীদেরকে  তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের ব্যবহারিক অংশটি হাতে কলমে শিখাতে  পারে। এভাবে শিখানোর বিষয়টি যদি অ্যাটাচমেন্টের মতো বাধ্যতামূলক করা হয় তাহলে উভয় শিক্ষার্থীরাই  উপকৃত  হবে। আগামী দিনের তথ্য প্রযুক্তিবিদ যারা হবে তারা নতুন প্রজন্মের মধ্যে এ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেয়ার মানবিক সহযোগিতার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।
এ বছর যেসব বিষয়ে কখনো প্র্যাকটিক্যাল ছিল না এরকম অনেক বিষয়ে প্র্যাকটিক্যাল যুক্ত করা হয়েছে। কম্পিউটার একটি প্র্যাকটিক্যাল ওরিয়েন্টেড বিষয়। এ বিষয়ে অবশ্যই প্র্যাকটিক্যাল থাকা উচিত। উচ্চ মাধ্যমিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে অর্ন্তভু ক্ত প্র্যাকটিক্যাল না থাকলে এ বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাবে- আগামী দিনের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে যে প্রশিক্ষিত ডিজিটাল কর্মী প্রয়োজন তা তৈরি করার জন্য অবশ্যই এ বিষয়ে ব্যবহারিক থাকা প্রয়োজন বলে বিজ্ঞ মহল মনে করেন।
writer- মাহবুবুর রহমান

২১ শতকের চ্যালেঞ্জে মোকাবেলায় ডিজিটাল ক্লাস রুমের প্রয়োগ

Detail

আমরা যারা একুশ শতকের মানুষ, আমরা যে বর্তমানে একটা ডিজিটাল যুগে বাস করছি এটা কি আমরা সবাই উপলব্ধি করতে পারছি? বিংশ শতকের শিক্ষা আর একুশ শতকের শিক্ষার মধ্যে যে তথ্যগত, প্রযুক্তিগত, শিক্ষন-শিখন পদ্ধতি, কারিকুলামসহ বিদ্যালয় ও শ্রেণীকক্ষের শিক্ষণ পরিবেশের মধ্যে যে পার্থক্য আছে, এটা হয়ত আমরা অনেকেই জানি না। এ শতক বিদ্যালয়ে আদর্শ শিক্ষন পরিবেশ সৃষ্টি করার কথা বলে, যেখানে বিশ্ব জ্ঞানভাণ্ডারের সাথে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকের মধ্যকার সেতুবন্ধ বা সংযোগ স্থাপন সম্ভব হবে।
টিকে থাকার জন্য আমাদের শিক্ষার্থীদের আয়ত্তে রাখতে হবে একুশ শতকীয় সাক্ষরতা- যার মধ্যে পড়ে মাল্টিকালচারাল, মিডিয়া, তথ্য, মনোজাগতিক, পরিবেশিক, অর্থনৈতিক ও সাইবার-সাক্ষরতা। এ-জাতীয় সাক্ষরতা বাড়াতে হলে দুনিয়ার অন্য দেশের ছাত্রছাত্রীদের সাথে মিথস্ক্রিয়া বাড়ানো দরকার। প্রতিযোগিতা নয়, বরং সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে বৈশ্বিক সংস্কৃতিতে মনোনিবেশ করতে হবে তথ্য-হাইওয়ের সাহায্যে। এ শতকের শিক্ষকের দায়িত্বকে সংজ্ঞায়িত করলে আমরা দেখতে পাই, শিক্ষকের কাজ হলো- to learn and help students to turn information into knowledge, and knowledge into wisdom. অর্থাৎ এ শতক কেবল তথ্য দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং তারা জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র তৈরি করে। একুশ শতকের কারিকুলামের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে, এটা আন্তঃবৈষয়িক, প্রজেক্টভিত্তিক ও গবেষণা-চালিত। এটি জাতীয় ও বিশ্বপর্যায়ের কমিউনিটির সঙ্গে জড়িত। এ শতকের কারিকুলাম higher order thinking skills, multiple intelligences, technology এবং multimedia এবং একইসাথে multiple literacy-কে অন্তর্ভুক্ত করে। কারিকুলাম textbook-driven বা fragmented নয় বরং এটা হতে হবে বিষয়কেন্দ্রিক, প্রজেক্টনির্ভর এবং সমন্বিত। এখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রজেক্টভিত্তিক কাজের মাধ্যমে নিজেরাই শিক্ষণ দক্ষতাগুলো অর্জন করবে। এ সকল কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঠ্যবই এবং অন্যান্য মাধ্যমগুলোও ব্যবহার করবে। এ শতকের শিক্ষা, শিক্ষার্থীদের প্রজেক্টভিত্তিক কাজের বিশ্বাস ও নির্ভরযোগ্য মূল্যায়নের ওপরে শিক্ষকদের অবদানকেও ব্যাখ্যা করে। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, “Real-world audiences are an important part of the assessment process, as is self-assessment”. অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্ব-মূল্যায়নের একটি গঠনমূলক অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাই একুশ শতকের শিক্ষা বর্তমানে কেবল শ্রেণীকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এ শতকের শিক্ষার্থীরা self-directed। তারা স্বাধীনভাবে এবং পারষ্পরিক মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করে।
পারষ্পরিক মিথষ্ক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার অন্যতম মাধ্যম হলো শ্রেণীকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার। এখন প্রশ্ন হলো, শ্রেণীকক্ষে শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কোন কোন প্রযুক্তি আমরা শ্রেণীকক্ষে ব্যবহার করতে পারি? শ্রেণীকক্ষে ব্যবহার উপযোগী প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে কম্পিউটার, প্রিন্টার, ডিজিটাল ক্যামেরা, স্ক্যানার, সাইন্স প্রোব, প্লটার, ইলেকট্রনিক হোয়াইটবোর্ড, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর উল্লেখযোগ্য। আমাদের দেশে শ্রেণীকক্ষগুলোতে একলাফে এই সকল প্রযুক্তির প্রয়োগ সম্ভব না হলেও শুরুর দিকে আলোচনা, ছবি প্রদর্শন, পাঠের বিষয়বস্তু সহজভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির কার্যকারিতা শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সামনে তুলে ধরতে হবে। পরবর্তীতে নানা ডেমো ক্লাস বা ওয়ার্কশপের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা উপস্থাপন করা যেতে পারে। এভাবে ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রযুক্তির প্রয়োগ শ্রেণীকক্ষে বাড়াতে হবে। নিচের চিত্রে একটি ডিজিটাল শ্রেনীকক্ষের ধারণা দেখান হলো।

ডিজিটাল ক্লাসরুম
প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত করবে যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহারই প্রমিত কার্যধারা। শ্রেণীকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার-
• শিক্ষার্থীদের যে কোনো উন্নয়নের জন্য creative, numerate, literate, well-trained এবং readily re-trainable করবে।
• শিক্ষকদের শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষণ পরিবেশ গঠনের ক্ষেত্রে উৎসাহিত করবে।
• বিদ্যালয় পাশ শিক্ষার্থীদের এমন বুনিয়াদি দক্ষতা ও কার্যকারিতা তৈরি করতে সহায়তা করবে যাতে তারা চাকরির বাজারে সফলতার সাথে উৎরে যায়।
কেবল এইগুলোই নয়, প্রযুক্তির ব্যবহার একুশ শতকের শিক্ষার্থীদের শিখন চাহিদা পুরণের সাথে সাথে ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে লড়াই করতে শেখাবে। আমরা উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে টেকসই উন্নয়নের কথা বলি, সেটি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
একুশ শতকের বিদ্যালয়, শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কারিকুলাম ও মূল্যায়নের এ ধারণা আমাদের দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকসহ সকল শিক্ষা ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ২০১১ সালে কম্পিউটার বিষয়টির প্রবর্তন একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হলেও কেবল কম্পিউটারকে পাঠ্য হিসেবে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করলেই শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি ব্যবহারে পটু হয়ে উঠবে না। নিঃসন্দেহে এটি একটি দারুণ পদক্ষেপ হলেও তা কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রদানে ব্যর্থ। প্রথমত, কেবল বিষয়ের অন্তর্ভুক্তিকরণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ হবার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখবে কি? দ্বিতীয়ত, পুঁথিগত বিদ্যাকে তারা ঠিক কতখানি বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কযুক্ত করতে শিখবে? তৃতীয়ত, বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ এবং ভূমিকা সম্পর্কে শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে সমর্থ হবে কি?
উপরিউক্ত প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর প্রদানের জন্য এ মুহূর্তে পর্যাপ্ত সুযোগ বা ব্যবস্থা আমাদের দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়নি। এখনও পর্যন্ত আমরা বুঝি বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে, দেশ এগিয়ে যাবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে, কম্পিউটারকে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিছু কিছু বিদ্যালয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের পরিবরতে হোয়াইট বোর্ডের সংযোজন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে এখনও পর্যন্ত শিক্ষকদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শ্রেণীকক্ষে মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার শুরু হয়নি। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের বাইরে বেরিয়ে প্রজেক্টভিত্তিক কাজের সুযোগ-সুবিধা পায় না। স্ব-শিখনকে আমলে এনে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অন্বেষণের ক্ষেত্রে ‘ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী’ হবার সম্ভাবনাকে আমলে এনে শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়নি এখনও পর্যন্ত। ৪৫ মিনিটের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত নির্ধারিত ক্লাসের সময়ে বিষয়ভিত্তিক তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিকের হাতেকলমের শিক্ষা ঠিক কতখানি ফলপ্রসূ হবে, এই ব্যপারে খানিকটা সন্দেহ রয়ে যায়।
এখন যেটা কাজের কথা সেটা হল, কী করে নিজেদের আমরা এই শতকের উপযুক্ত করে তুলতে পারি? আমাদের শিক্ষার শুরুটা হল বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে। কাজেই প্রথম যে পদক্ষেপটি নিতে হবে সেটা হলো, শিক্ষার্থীদের শিক্ষণের জন্য একুশ শতকের উপযোগী ডিজিটাল ক্লাসরুম নিশ্চিতকরণ। ক্যারিবিয় অঞ্চলে এক সময় শ্রেণীকক্ষের চিত্র ছিল একটি টিপিক্যাল ক্লাসরুমের মতো। বসবার জন্য সারিবদ্ধ টেবিল-চেয়ার, ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে চক হাতে বিষয় শিক্ষকের টানা বক্তৃতা দিয়ে যাওয়া, হিপনোটাইজড শিক্ষার্থীদের চোখ চুম্বকের মতো শিক্ষকের প্রতিটি শব্দের ওপরে আটকে যাওয়া, বোর্ডে লিখে যাওয়া পাখির বুলি- এমনটিই ছিল শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ। এখন সে পরিবেশ বদলে এখন সেখানে শ্রেণীকক্ষে কম্পিউটার টেকনোলজি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। পূর্বে তাদের শ্রেণীকক্ষে টেলিভিশন, রেডিও, ভিসিআর, ওভারহেড প্রজেক্টার টেকনোলজির ব্যবহার ছিল। পরবর্তীতে কম্পিউটার টেকনোলজি ব্যবহার শুরু করা হয়েছে। ব্যক্তিগত কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের আবির্ভাব তাদের শিক্ষন-শিখনের মান উন্নয়ন ঘটিয়েছে। যুক্তরাজ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতি ছয় জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি নয় জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি কম্পিউটার বরাদ্দ করা হয়েছে। সেখানে শতকরা ৯৯ ভাগ শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত। যেখানে শিক্ষকরা আইসিটির ওপরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যা কিনা ১৯৯৮ থেকে ২০০২ এসে শতকরা ৬৩ ভাগ থেকে ৭৭ ভাগে উন্নীত হয়েছে। আমরা যদি একই বিচারে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রয়োগ এর কথা চিন্তা করি তাহলে কী দেখতে পাই? নিঃসন্দেহে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এই পিছিয়ে থাকাটা যে ঠিক কতখানি তা আমদের ধারণার বাইরে। আমাদের হাতে হাতে মোবাইল, ঘরে ঘরে টিভি, কম্পিউটারের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এ প্রযুক্তিগুলোকে যে কেবল বিনোদনের জন্য নয়, শিক্ষার কাজেও লাগানো সম্ভব এটা আমরা কজনই বা মানি। শ্রেণীকক্ষে মোবাইল ব্যবহার করে ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হওয়া যায়, টেলিভিশনের মাধ্যমে দূর শিক্ষণকে জনপ্রিয় করা সম্ভব, কম্পিউটারের মাধ্যমে করা যায় না এমন কী আছে? এগুলো সব কাজের কথা, প্রয়োজনের কথা। কিন্তু এ প্রয়োজনটা শিক্ষকদের বোঝানো দরকার আর সেটা করতে হবে হাতেকলমে। শিক্ষার ক্ষেত্রে উদ্যোগটা নিতে হবে নিজেকেই। কারণ আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে সরকারের পক্ষে দেশ চালানোর ঠেলা সামলে এককভাবে শিক্ষার উন্নয়নের কথা চিন্তা করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগকে তাই প্রাধান্য দিতে হবে। চিন্তা চেতনায় স্বকীয়তা তৈরি করতে না পারলে কে কখন শেখাবে আর সাহায্য করবে এ আশাতেই তীর্থের কাকের মতন সময়টা গড়িয়ে যাবে বিনা উন্নয়নে। মোদ্দা কথা হল, উন্নয়ন চাই এবং সেটা টেকসই হতে হবে। এই উন্নয়নকে তরান্বিত করতে সাহায্য করবে শ্রেণীকক্ষে ডিজিটাল প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার। প্রকৃতপক্ষে এই ব্যবহার বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ থেকে শুরু না করলে দেশের উন্নয়নকে সামনের দিকে ক্রমশ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়; কারণ একটা জাতি তখনই উন্নতির দিকে এগিয়ে যায় যখন সে জাতি তাঁর শিক্ষা ব্যবস্থার ভিতকে মজবুত করে।
Let us think of education as the means of developing our greatest abilities, because in each of us there is a private hope and dream which, fulfilled, can be translated into benefit for everyone and greater strength for our nation. -John F. Kennedy (1917-1963) Thirty-fifth President of the USA
  ফারহানা মান্নান: লেখক, শিল্পী, শিক্ষা-গবেষক। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগবেষণায় স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত

Displaying All

 
Support : | RSTSBD | RSTSBD
Copyright © 2017. রূপকল্প ২০৪১ - All Rights Reserved
This Blog Published by RSTSBD
Created by Uno Badalgachi